কিডনি
কিডনি মানব দেহের একটি গুরুত্ব পূর্ণ অঙ্গ। এটি বিকল হয়ে যাওয়ার লক্ষণ সহজে প্রকাশ পায় না। কারণ ৭০ থেকে ৮০ ভাগ বিকল হওয়ার পর প্রকাশ পায়। kidney রোগীদের দেখা যায় খাওয়ায় রুচী থাকেনা, বমি বমি ভাব হয়, মাঝে মাঝে ঘুম থেকে উঠলে চোখ-মুখ ফোলা দেখায় অর্থাৎ চোখের নিচের অংশ বেশি ভারি ভারি হয়ে থাকে।
এছাড়া আস্তে আস্তে রক্ত শূণ্যতা দেখা দেয়। চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। বিনা কারণে শরীর চুলকায়, গায়ের রঙ পরিবর্তন হয়ে যায়। রাতে অনেকবার প্রস্রাব করতে হয়। কারও কারও উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে। যখন এটি খুব বেশি আক্রান্ত হলে সবগুলো অঙ্গই ধীরে ধীরে আক্রান্ত হয়ে যায়। এ জন্য এই রোগটিকে নিরব ঘাতক বলা হয়। কখনই শুধু শুধু বা হটাৎ কিডনি বিকল হবে না। অনেকগুলো রোগের কারণে এটি বিকল হয়ে যায়। সেই রোগগুলো প্রাথমিক অবস্থায় সনাক্ত করা সম্ভব। যেমন- যদি কখনও প্রস্রাব কমে যায়। অথবা দেখা যাচ্ছে রাতে প্রস্রাব হতো না এখন রাতে প্রস্রাব হচ্ছে। প্রস্রাবে জালাপোড়া করে। প্রস্রাব করার পরেও কিছু প্রস্রাব থেকে যায়। কোমড়ের দুই পাশে ব্যথা এবং কাপুনি থাকে। আবার দেখা যাচ্ছে প্রস্রাবে প্রচুর ফেনা থাকে। মুখ ফুলে যায়। এধরণের পরির্বতন হচ্ছে কিনা খিয়াল করতে হবে। সমস্যা মনে হলে দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
কিডনি রোগের বিস্তারিত লক্ষণ
১. প্রস্রাবে পরিবর্তন:
প্রস্রাবে পরিবর্তন হওয়া কিডনি রোগের একটি বড় লক্ষণ । কিডনির সমস্যা হলে প্রস্রাব বেশি হয় বা কম হয়। বিশেষ করে রাতে এই সমস্যা বাড়ে। প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়। অনেক সময় প্রস্রাবের বেগ অনুভব হলেও প্রস্রাব হয় না।
২. প্রস্রাবের সময় ব্যথা:
কিডনির সমস্যার আরেকটি লক্ষণ হলো প্রস্রাবের সময় ব্যথা হওয়া। প্রস্রাবের সময় ব্যথা, জ্বালাপোড়া- এগুলো ইউরিনারি ইনফেকশনের লক্ষণ। যখন এটি কিডনিতে ছড়িয়ে পড়ে তখন জ্বর হয় এবং পিঠের পেছনে ব্যথা করে।
৩.প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া:
প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া। প্রস্রাবের সাথে রক্ত গেলে মনে রাখতে হবে এটি খুবই ঝুঁকির বিষয়।এমন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষণ।
৪. শরীর ফোলা ভাব:
কিডনি শরীর থেকে বাড়তি পানি এবং বর্জ্য বের করে দেয়। কিডনিতে রোগ হলে এই বাড়তি পানি বের হতে সমস্যা হয়। বাড়তি পানি শরীরে ফোলাভাব তৈরি করে। শরীরে পানি জমে।
৫. মনোযোগ দিতে অসুবিধা হওয়া:
লোহিত রক্তকণিকা কমে যাওয়ার কারণে মস্তিস্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়। এর কারণে কাজে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হয়।
৬. সবসময় শীত লাগা:
কিডনি রোগ হলে গরম আবহাওয়ার মধ্যেও শীত শীত লাগে। আর কিডনিতে সংক্রমণ এর কারণে শরীরে জ্বরও আসতে পারে।
৭. ত্বকে র্যাশ হওয়া:
কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়লে রক্তে বর্জ্য পদার্থ বাহির হতে পারে না। ফলে রক্তে বর্জ্য পদার্থ বাড়তে থাকে। এই কারণে ত্বকে চুলকানি এবং র্যাশ তৈরি করতে পারে।
৮. বমি বা বমি বমি ভাব:
রক্তে বর্জ্য পদার্থ বেড়ে যাওয়ার কারণে কিডনি রোগীর বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়ার সমস্যা হতে পারে।
৯. ছোট ছোট শ্বাস:
এই রোগের কারণে ফুসফুসে তরল পদার্থ জমা হয়। এ ছাড়াও কিডনি রোগে শরীরে রক্তশূন্যতাও দেখা দেয়। এইসব কারণে শ্বাসের সমস্যা হয়, তাই রোগী অনেকে ছোট ছোট করে শ্বাস নেয়।
১০. পেছনে ব্যথা:
অনেক রোগীর শরীরে ব্যথা হয়। পিঠের পাশে নিচের দিকে ব্যথা হয়। এটিও কিডনি রোগের একটি অন্যতম লক্ষণ।
কাদের সতর্ক হওয়া উচিৎ
যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতা আছে, যাদের ধূমপানের অভ্যাস আছে, যাদের বয়স ৫০ বা তার অধিক, যাদের পরিবারে কারো কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে। তাদের অনেক সতর্ক থাকতে হবে।
সুরক্ষা থাকতে নিচের নিয়ম মেনে চলুন
- নিজেকে সবল ও কর্মব্যস্ত রাখতে চেস্টা করুন।
- রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখুন।
- মাঝে মাঝে চেকআপ করে রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করুন।
- সুষম খাদ্য খান।
- ওজন নিয়ন্ত্রণ রাখুন।
- পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন।
- ধূমপান পরিহার করুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকুন।
- আপনি যদি কিডনি ঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে একাধিক কিডনি রোগ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করুন।
কারা আক্রান্ত হয়?
পৃথিবীতে শতকরা ১০ জন মানুষ কিডনি রোগে ভুগছেন। কিডনি রোগ সব বয়সের মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। তবে ৭৫ বৎসর বয়সের ৫০ শতাংশ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। ৬৫-৭৫ বয়সের প্রতি ৫ জনে একজন পুরুষ। প্রতি ৪ জনে একজন নারী কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে । দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের প্রধান কারণ হলো উচ্চ রক্তচাপ এবং বহুমূত্র রোগ ।
তাহলে আপনি নিজের মধ্যে খিয়ালা করুন। আপনি কি ঝুঁকিতে আছেন কি না? এখন লক্ষ্য করুন-
- আপনার কি উচ্চ রক্তচাপ আছে?
- আপনি কি বহুমূত্র রোগে ভুগছেন?
- আপনার পরিবারের কোন সদস্যের কি kidney রোগ আছে?
- আপনার দৈহিক ওজন কি বেশি?
আপনার উত্তর এক বা একাধিক হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ kidney রোগ একটি নীরব ঘাতক, যা আপনার সুস্থ জীবন-যাপন বাধাগ্রস্ত করে। আমরা এখানে কিছু সহজ উপায় বলছি যা আপনাকে kidney রোগ থেকে রক্ষা করবে।
কিডনি রোগ প্রতিরোধে করণীয়
কিডনি রোগ একটি নীরব ঘাতক। বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি লোক কোনো না কোনো kidney রোগে আক্রান্ত। kidney বিকল হয়ে প্রতি ঘণ্টায় পাঁচজনের মৃত্যু হচ্ছে। kidney বিকল রোগীর চিকিৎসা এত ব্যয়বহুল যে, এ দেশে শতকরা ৫ ভাগ লোকেরও দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। সাধারণত ৭০ ভাগ কিডনি নষ্ট হওয়ার আগে রোগীরা বুঝতেই পারে না যে সে ঘাতক ব্যাধিত কিডনি রোগে আক্রান্ত। এই ঘাতক ব্যাধি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় শুরুতেই কিডনি রোগ নির্ণয় ও kidney বিকল প্রতিরোধ করা।
kidney বিকল প্রতিরোধের কায়েকটি উপায়
১. উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও নেফ্রাইটিস kidney বিকলের প্রধান কারণ।
২. ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। (HBAIC ৭ (সাত) এর নিচে)
৩. উচ্চ রক্তচাপ আক্রান্ত রোগীদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। (১৩০/৮০এর নিচে)
৪. ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ আক্রান্ত রোগীদের কিডনির কার্যকারিতা ও প্রস্রাবে মাইক্রো অ্যালবুমিন প্রতি ৬ মাস অন্তর পরীক্ষা করতে হবে।
৫. শিশুদের গলাব্যথা, জ্বর ও ত্বকে খোসপাঁচড়ার দ্রুত সঠিক চিকিৎসা করতে হবে।
৬. ডায়রিয়া হওয়া, বমি ও রক্ত আমাশয় হওয়া। এই কারণে পানি ও লবণ শূন্য হয়ে kidney বিকল হতে পারে। তাই দ্রুত খাবার স্যালাইন খেতে হবে। প্রয়োজনে শিরায় স্যালাইন দিতে হবে
৭. ধূমপান বর্জন করতে হবে।
৮. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
৯.নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।
১০. চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত এন্টিবায়োটিক ও তীব্র ব্যথার ওষুধ সেবন করা যাবে না।
১১. প্রস্রাবের ঘন ঘন ইনফেকশনের হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে হবে।
১২. পাঁচ রঙের সবজি খাবেন, পরিমাণ মত পানি পান করবেন ও বেশি করে ফল খাবেন, আর চর্বি জাতীয় খাবার ও লবণ কম খাবেন ।
এম এম এইচ আহমদ
আরো পড়ুন








