টিউবারকুলোসিস (TB) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা
টিবি নিরাময়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা
একজন মহিলা রোগীর ডান কণ্ঠাস্থির (ক্লাভিকল) উপরে অবস্থিত লিম্ফ নোডে টিউবারকুলোসিস বা ক্রনিক গ্রানুলোমাটোস ইনফ্লামেশন ধরা পড়েছিল।
রোগীর ইতিহাস
- ২০২১ সালে ডান ক্লাভিকলে ফোড়ার মতো একটি সমস্যা দেখা দেয়, যা প্রচলিত চিকিৎসায় ভালো হচ্ছিল না।
- FNA পরীক্ষা করলে টিউবারকুলোসিস (TB) ধরা পড়ে এবং নিয়মিত চিকিৎসার কোর্স সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু রক্ত ও পুঁজ বন্ধ হচ্ছিল না এবং মাংস দেবে যেতে থাকে।
- রোগী বিকল্প চিকিৎসার সন্ধান করে আমাদের কাছে আসেন।
- পুনরায় টিউবারকুলোসিস পরীক্ষা করানো হলে এটি তখনো পজিটিভ ছিল।
- আমরা বিশেষ চিকিৎসা শুরু করি, অল্প সময়ের মধ্যে ফোড়া শুকিয়ে যায়, মাংস পূরণ হতে থাকে এবং স্কিন স্বাভাবিক হয়।
- পরবর্তীতে পরীক্ষা করে টিউবারকুলোসিস নেগেটিভ পাওয়া যায়। আলহামদুলিল্লাহ।
টিউবারকুলোসিস (TB) কী?
টিউবারকুলোসিস (টিবি) একটি সংক্রামক রোগ যা Mycobacterium tuberculosis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। এটি সাধারণত ফুসফুসকে আক্রমণ করে তবে শরীরের অন্যান্য অংশ যেমন কিডনি, মেরুদণ্ড ও মস্তিষ্কও আক্রান্ত হতে পারে।
টিবির প্রধান লক্ষণ:
- দীর্ঘস্থায়ী কাশি (৩ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে)
- কাশির সাথে রক্ত যাওয়া
- জ্বর (বিশেষ করে সন্ধ্যায়)
- রাতে ঘাম হওয়া
- ওজন হ্রাস এবং ক্ষুধা কমে যাওয়া
- ক্লান্তি ও দুর্বলতা
- লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া (Swollen lymph nodes)
টিবি কীভাবে ছড়ায়?
- টিবি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি বা কথা বললে ব্যাকটেরিয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্য ব্যক্তি শ্বাসের মাধ্যমে এটি গ্রহণ করতে পারে।
- তবে, এটি সহজে ছড়ায় না; সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের প্রয়োজন হয়।
টিবির ধরন:
- সক্রিয় টিবি: ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় থাকে এবং লক্ষণ দেখা দেয়। এটি অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে।
- নিষ্ক্রিয় (Latent) টিবি: ব্যাকটেরিয়া শরীরে উপস্থিত থাকে কিন্তু সক্রিয় নয়, লক্ষণ দেখা দেয় না এবং এটি অন্যদের মধ্যে ছড়ায় না, তবে ভবিষ্যতে সক্রিয় হতে পারে।
টিবি নির্ণয়ের পদ্ধতি:
- Mantoux test (TST)
- রক্ত পরীক্ষা (IGRA)
- বুকের এক্স-রে
- কফ (শ্লেষ্মা) পরীক্ষা
টিবি প্রতিরোধ ও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মূলত BCG ভ্যাকসিন ও উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপির (যেমন Isoniazid, Rifampicin) পরামর্শ দেন।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা:
হোমিওপ্যাথিতে কিছু প্রতিরোধমূলক ওষুধ ব্যবহৃত হয়, তবে এগুলো শতভাগ কার্যকর প্রমাণিত নয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়।
সম্ভাব্য ওষুধসমূহ:
- টিউবারকুলিনাম (Tuberculinum): রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক, বিশেষত যদি পরিবারে টিবির ইতিহাস থাকে।
- সিলিসিয়া (Silicea): শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।
- কালকারিয়া কার্বোনিকা (Calcarea Carbonica): দুর্বল ইমিউন সিস্টেম, রাতের ঘাম ও ওজন কমার উপসর্গে ব্যবহৃত হয়।
- ফেরাম ফস (Ferrum Phosphoricum): প্রাথমিক পর্যায়ের ফুসফুস সংক্রমণের বিরুদ্ধে সহায়ক হতে পারে।
প্রতিরোধের জন্য করণীয়:
✔ BCG ভ্যাকসিন গ্রহণ করা (বিশেষ করে শিশুদের জন্য) ✔ পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করা (ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করতে) ✔ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ও দূষিত বাতাস এড়িয়ে চলা ✔ টিবি আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এলে মেডিকেল পরীক্ষা করানো
সারসংক্ষেপ
- টিউবারকুলোসিস (TB) একটি সংক্রামক রোগ যা ফুসফুসসহ শরীরের অন্যান্য অংশকে আক্রান্ত করতে পারে।
- এটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় এবং দীর্ঘস্থায়ী লক্ষণ দেখা দেয়।
- চিকিৎসার জন্য প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি ও BCG ভ্যাকসিন সবচেয়ে কার্যকর।
- হোমিওপ্যাথিক প্রতিরোধমূলক কিছু ওষুধ থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়।
- রোগ প্রতিরোধে পুষ্টিকর খাবার, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা এবং সংক্রমিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
আল্লাহ আমাদের সকলকে সুস্থ রাখুন! আমিন।











