সিফিলিস: লক্ষণ ও নির্ণয়
সিফিলিস হলো একটি যৌনভাবে সংক্রামিত রোগ (Sexually Transmitted Infection, STI), যা সাধারণত সংক্রামিত হয় সঙ্গমের মাধ্যমে। এই রোগটি Treponema pallidum নামক ব্যাক্টেরিয়ার কারণে হয়। সিফিলিস ত্বক বা মিউকাস মেমব্রেনের সংক্রামিত ছোট আঘাত বা ঘা মাধ্যমে সংক্রামিত হতে পারে। এই রোগটি চারটি ধাপে বিভক্ত।
সিফিলিসের প্রকার:
- প্রাথমিক সিফিলিস (Primary syphilis): সংক্রমণের প্রথম ধাপে সংক্রামিত স্থানে একটি ব্যথাহীন ওলকনি বা আলসার তৈরি হয়, যা চিকিৎসা না নিলে কয়েক সপ্তাহ পরে নিজে থেকেই সারে যায়।
- দ্বিতীয় ধাপ সিফিলিস (Secondary syphilis): যদি প্রাথমিক ধাপের সিফিলিস চিকিৎসা না হয়, তাহলে রক্ত ও লিম্ফ নালীর মাধ্যমে ব্যাক্টেরিয়া সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এই ধাপে ত্বকে র্যাশ ও ফ্লু-এর মতো লক্ষণ দেখা যায়।
- অন্তরালীয় সিফিলিস (Latent syphilis): এই ধাপে রোগটি কোনো লক্ষণ প্রকাশ না করেও সক্রিয় থাকতে পারে। এ সময়ে সিফিলিসের অস্তিত্ব শুধুমাত্র রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই নির্ণয় করা সম্ভব।
- তৃতীয় ধাপ সিফিলিস (Tertiary syphilis): এই স্টেজটি খুবই গুরুতর এবং জীবনঘাতী হতে পারে। এ সময়ে হৃদয়, মস্তিষ্ক, অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং স্নায়ু সিস্টেম আক্রান্ত হয়।
উৎস:
সিফিলিস (Syphilis) এর উৎস হলো Treponema pallidum নামের একটি ব্যাক্টেরিয়া। এই ব্যাক্টেরিয়া যৌনসম্পর্ক, বিশেষত যোনি, মুখ বা গুদামার্গের মাধ্যমে অথবা সংক্রমিত মাতা থেকে ভ্রূণে সংক্রমণের মাধ্যমে মানুষে ছড়ায়। দুর্লভ ক্ষেত্রে, এই সংক্রমণ সংক্রমিত রক্ত গ্রহণ অথবা সংক্রামিত অঙ্গ দানের মাধ্যমেও হতে পারে।
সিফিলিস পরিবেশ বা সাধারণ ব্যবহার্য জিনিসপত্র যেমন টয়লেট সিট, দরজার হাতল, সুইমিং পুল ইত্যাদি দ্বারা ছড়ায় না, কারণ Treponema pallidum ব্যাক্টেরিয়া মানবদেহ ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে না।
মানবদেহের প্রবেশের পর Treponema pallidum ব্যাক্টেরিয়াটি রক্তনালী ও লিম্ফ নোডের মাধ্যমে অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সিফিলিসের লক্ষণগুলো উদ্ভূত করতে থাকে।
প্রাথমিক পর্যায়ের লক্ষণগুলি হলো:
- চ্যানকর (Chancre): যৌনাঙ্গে, পায়ুপথ বা ঠোঁট ও মুখের ভেতরে একটি বা একাধিক কঠিন, বাদামি ও ব্যথাহীন ঘা। এই ঘা হলো প্রথম লক্ষণ এবং এটি Treponema pallidum ব্যাক্টেরিয়ার প্রবেশস্থলে ঘটে।
- অঞ্চলগত লিম্ফ নোড ফুলা (Regional Lymphadenopathy): চ্যানকরের কাছাকাছি লিম্ফ নোডগুলি ফুলে যেতে পারে, তবে এটি প্রায় ব্যথাহীন হয়ে থাকে।
- ঘা ধীরে ধীরে সেরে যাওয়া: চিকিৎসা না করালেও চ্যানকর সাধারণত ৩-৬ সপ্তাহের মধ্যে নিজে নিজে সেরে যায়, কিন্তু ব্যাক্টেরিয়া দেহে থেকে যায় এবং রোগটি পরবর্তী পর্যায়ে আরও জটিল হতে পারে।
প্রাথমিক সিফিলিসের লক্ষণগুলি অবশেষে নিজে নিজে সেরে যায়, তবে ব্যক্টেরিয়া শরীরে রয়ে যায় এবং যদি উপযুক্ত চিকিৎসা না করা হয়, রোগটি আরও গুরুতর পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
সিফিলিসের দ্বিতীয় ধাপের লক্ষণগুলি হলো:
- সারা শরীরে র্যাশ (Rashes): প্রায়ই হাতের তলা এবং পায়ের তলায় দেখা যাওয়া এই র্যাশ কাঁচা মাংসের রঙের অথবা মাংসের রঙের স্পট হিসাবে দৃশ্যমান হয়।
- মিউকাস ঝিল্লির ঘা (Mucous Membrane Lesions): মুখের, যৌনাঙ্গের, এবং গুদামার্গের মিউকাস ঝিল্লিতে দেখা দেয়া এক ধরনের ঘা।
- সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো লক্ষণ (Flu-like symptoms): এতে জ্বর, গলা ব্যথা, অস্থিসন্ধিশূল, মাথা ব্যথা, এবং ক্লান্তি অন্তর্ভুক্ত থাকে।
- লিম্ফ নোড সঞ্চালন (Lymphadenopathy): শরীরের লিম্ফ নোডগুলি বড় এবং সেনসিটিভ হতে পারে।
- আলোপেসিয়া (Hair Loss): কিছু ক্ষেত্রে, চুল পড়া বা প্যাচ-প্যাচে চুল হারানো দেখা যায়।
রোগের এই দ্বিতীয় ধাপটি প্রায় ৪-১০ সপ্তাহের পরে শুরু হতে পারে এবং কয়েক সপ্তাহ থেকে মাসের জন্য স্থায়ী হতে পারে। যদি চিকিৎসা না করা হয়, তবে এই লক্ষণগুলি আত্ম-নিরাময়ের পর রোগটি অন্তরালীয় ধাপে প্রবেশ করতে পারে, যেখানে কোন লক্ষণ থাকবে না। তবে, সিফিলিস নিরাময় না হওয়া অবস্থায় বহু বছর পর্যন্ত থাকতে পারে এবং পরবর্তীকালে গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতায় নিয়ে যেতে পারে।
সিফিলিসের তৃতীয় ধাপের লক্ষণগুলি হলো:
1. গামমাস (Gummas):
- শরীরের বিভিন্ন অংশে গামমা নামে পরিচিত ব্যথাহীন, টিউমার-এর মতো গঠন দেখা দিতে পারে, যেগুলি মাংসপেশী, হাড়সহ শরীরের ভিতরের নরম কলা হিসেবে হতে পারে।
2. নিউরোসিফিলিস (Neurosyphilis):
- মস্তিস্ক এবং স্নায়বিক সিস্টেমে প্রভাব পড়ে, যার ফলে মাথা ব্যথা, মানসিক দুর্বলতা, কথা বলা সমস্যা, দৃষ্টি ক্ষয়, চলাচলের সমস্যা, প্যারালিসিস, এবং মাঝে মাঝে মানসিক রোগ যেমন উন্মাদনা দেখা দেয়।
3. কার্ডিওভ্যাসকুলার সিফিলিস (Cardiovascular Syphilis):
- হৃদপিণ্ড এবং মহাধমনীতে প্রদাহ দেখা দেয়, যা আনিউরিজম বা ধমনীর দেওয়াল দুর্বল হতে পারে, হার্ট ভালভের সমস্যা করতে পারে।
4. অঙ্গ-প্রতিঙ্গের ক্ষতি (Damage to Multiple Organs):
- তৃতীয় ধাপের সিফিলিস অনেকগুলি অঙ্গে ক্ষতি করতে পারে, যা অন্যান্য জটিল মেডিকেল অবস্থাগুলিকে জন্ম দিতে পারে।
সিফিলিসের তৃতীয় ধাপ প্রায়ই দশ বা এরও বেশি বছর পরে প্রকাশিত হয়, এবং এটি রোগীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে যদি এটি চিকিৎসা করা না হয়। রোগের এই উচ্চতর ধাপে ব্যক্টেরিয়ার ফলে ক্ষতির পরিমাণ স্থায়ী হয়ে যেতে পারে এবং এর ফলে সংশোধন করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
সিফিলিস যদি চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে এটি বিভিন্ন ধরনের জটিলতায় পরিণত হতে পারে, যা অনেক গুরুতর এবং জীবনহানিকর হতে পারে।
সিফিলিসের জটিলতাগুলি নিম্নরূপ:
নিউরোসিফিলিস (Neurosyphilis):
- সিফিলিস যদি মস্তিস্ক এবং মেরুদণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে এটি ব্যাপক নিউরোলজিক্যাল ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে, যেমন মেনিনজাইটিস, মাথা ব্যথা, অসহিষ্ণুতা, দৃষ্টি ক্ষতি, হালকা পরিবর্তন, এবং মৃত্যু।
কার্ডিওভ্যাসকুলার সিফিলিস (Cardiovascular Syphilis):
- হৃদযন্ত্রের রক্তনালীগুলির প্রদাহ, যা আর্টারিক অ্যানিউরিজম ও হার্ট ভালভের সমস্যাগুলির কারণ হয়।
চোখের সমস্যা (Ocular Syphilis):
- চোখের সংক্রমণ আঘাত জনিত, যা ইউভাইটিস, রেটিনাইটিস, অ্যান্ড অন্ধত্ব ঘটাতে পারে।
জন্মগত সিফিলিস (Congenital Syphilis):
- অজন্মা শিশুদের মা থেকে সিফিলিস সংক্রমিত হতে পারে, যা গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু, মৃত জন্ম, বা জন্মনির্ভর অসুস্থতা, যেমন হাড়ের ক্ষতি, লিভার ও প্লীহার বৃহত্ত্ব, ও চোখের সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
এইচআইভি সংক্রমণের বৃদ্ধি (Increased Risk of HIV Infection):
- যৌন সংক্রমিত রোগের অন্য একটি জটিলতা হচ্ছে এইচআইভি সংক্রমণের বৃদ্ধি, বিশেষ করে যদি চ্যানক্রে বা অন্যান্য ঘা উন্মুক্ত থাকে।
এই এবং অন্যান্য জটিলতাসমূহ এড়াতে এবং তার গুরুতর পরিণতির থেকে বাঁচতে সময়মতো নির্ণয় এবং চিকিৎসা অত্যন্ত প্রয়োজন।
নিরাপদ থাকার উপায়:
সিফিলিস থেকে বাচার জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলি অনুসরণ করা সহায়ক হতে পারে:
1. নিরাপদ যৌন অভ্যাস:
- ব্যবহার করুন কনডম বা ডেন্টাল ড্যাম যে কোনো যৌন মিলনের সময়, বিশেষ করে অজানা বা একাধিক যৌন পার্টনারের সাথে।
- একই যৌন পার্টনারের সাথে অক্ষয় যৌন সম্পর্ক রাখুন, যেখানে দুজনেই সংক্রমণের বিষয়ে পরীক্ষা করা এবং নেগেটিভ রিপোর্ট আছে।
2. রেগুলার স্বাস্থ্য পরীক্ষা:
- নিয়মিত যৌন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন, বিশেষ করে যদি আপনি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীতে পড়েন।
- স্বাস্থ্য পরীক্ষা অ্যান্টিনাল কেয়ার (antenatal care) চিকিৎসা অংশ হিসাবে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
3. শিক্ষা ও সচেতনতা:
- শিক্ষা নিন ও অবহিত হন যৌন রোগজনিত সিফিলিসের লক্ষণ এবং কিভাবে এটি প্রতিরোধ করা যায়।
4. অ্যালকোহল এবং মাদক বিবেচনা:
- অ্যালকোহল এবং মাদকদ্রব্য আপনার বিচার-বুদ্ধির ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং অসুরক্ষিত যৌন আচরণের সম্ভাবনা বাড়ায়।
5. সঠিক চিকিৎসা:
- যদি আপনি বা আপনার যৌন পার্টনার সিফিলিস পজিটিভ হন, তাহলে সম্পূর্ণ কোর্স অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি গ্রহণ করুন।
- চিকিৎসার সময় এবং পরের সম্মিলনের আগে পূর্ন সময় পর্যন্ত সেক্সুয়াল অ্যাক্টিভিটি বাদ দিন বা সাবধানতা ব্যবহার করুন।
6. পার্টনারের নোটিফিকেশন এবং চিকিৎসা:
- আপনার যৌন পার্টনারদের সংক্রমণের বিষয়ে জানান এবং তাদের পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসার জন্য উৎসাহিত করুন।
সচেতনতা এবং সঠিক ব্যবহার সিফিলিসের মতো যৌন সংক্রামিত রোগ থেকে নিজেকে এবং অন্যদের বাঁচাতে মৌলিক ভূমিকা পালন করে।
পরিক্ষা:
সিফিলিসের পরীক্ষণের জন্য বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা রয়েছে, যার মাধ্যমে সিফিলিসের উপস্থিতি ও তার পর্যায় নিরীক্ষণ করা হয়। এই পরীক্ষাগুলি নিম্নরূপ:
রক্ত পরীক্ষা (Blood Tests):
রক্ত পরীক্ষাগুলি সংক্রমণের জন্য অ্যান্টিবডি বা ট্রেপোনেমার উপস্থিতি পরীক্ষা করে। এর অন্তর্গত হলো:
-
ননট্রেপোনিমাল টেস্ট (Nontreponemal tests):
- RPR (Rapid Plasma Reagin)
- VDRL (Venereal Disease Research Laboratory)
-
ট্রেপোনেমাল টেস্ট (Treponemal tests):
- FTA-ABS (Fluorescent Treponemal Antibody Absorption)
- TPPA (Treponema Pallidum Particle Agglutination)
- EIA (Enzyme Immunoassays)
- MHA-TP (Microhemagglutination assay for Treponema pallidum)
সিরিয়াল বা লুম্বার পাংচার (Cerebrospinal Fluid Analysis):
নিউরোসিফিলিসের নিরীক্ষণের জন্য, সিরিয়াল তরল পরীক্ষা করা হতে পারে।
ডার্কফিল্ড মাইক্রোস্কপি (Darkfield Microscopy):
প্রাথমিক সিফিলিসের চ্যানকর থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করে ট্রেপোনেমা প্যালিডাম সনাক্ত করা হয়।
ডায়রেক্ট ফ্লুওরেসেন্ট অ্যান্টিবডি (Direct Fluorescent Antibody) টেস্ট:
এটি সরাসরি ট্রেপোনেমা প্যালিডাম সনাক্ত করার একটি পদ্ধতি।
র্যাপিড ইমিউনোক্রোমাটোগ্রাফিক পরীক্ষা (Rapid Immunochromatographic Test):
এটি একটি দ্রুত এবং বহনযোগ্য পরীক্ষা, যা যৌন স্বাস্থ্য ক্লিনিক বা ফিল্ড কন্ডিশনে সহজেই পরীক্ষা করা যায়।
সিফিলিসের পরীক্ষার ফলাফল চিকিৎসা পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ঝুঁকি বা লক্ষণ দেখা দিলে যথাসময়ে পরীক্ষা করানো জরুরি।
চিকিৎসার জন্য প্রধানত পেনিসিলিন জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। প্রাথমিক বা দ্বিতীয় ধাপে সনাক্ত হলে সিফিলিস সহজেই নিরাময়যোগ্য, তবে তৃতীয় ধাপে পৌঁছালে চিকিৎসা জটিল হয়ে স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি থাকে।
প্রতিরোধের জন্য সুরক্ষিত যৌনাচার, সঙ্গীর সঙ্গে সততা, এবং নিয়মিত যৌন রোগ পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।












