ভূমিকা
ফ্যারিঞ্জাইটিস হল গলার একটি সাধারণ অবস্থা, যা আমাদের স্বরযন্ত্রের প্রদাহ দ্বারা চিহ্নিত হয়। এটি প্রায়শই “গলাব্যথা” নামে পরিচিত। এই অবস্থার সাথে প্রায়ই গিলতে কষ্ট হওয়া, খুসখুসে অনুভূতি এবং জ্বর হয়।
এই রোগের কারণ
ফ্যারিঞ্জাইটিস সাধারনত নিম্নলিখিত কারণগুলোর দ্বারা সৃষ্টি হয়:
- ভাইরাল ইনফেকশন: সাধারণ ঠান্ডা লাগা, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং এডেনোভাইরাস হল ফ্যারিঞ্জাইটিসের মূল ভাইরাল কারণ।
- ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন: গ্রুপ এ স্ট্রেপ্টোকক্কাসের মতো ব্যাকটেরিয়া এক ধরণের ফ্যারিঞ্জাইটিস সৃষ্টি করে যাকে ‘স্ট্রেপ থ্রোট’ বলা হয়।
- এলার্জিক রিঅ্যাকশন: পরাগ, ধূলিকণা, প্রাণীর লোম ইত্যাদির প্রতি আলার্জি।
- ইরিট্যান্টস: ধূমপান, বায়ু দূষণ, কেমিক্যাল বা ধোঁয়া গলার প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
ফ্যারিঞ্জাইটিস এবং টনসিলাইটিস এর মাঝে পার্থক্য
দুটি আলাদা গলার সমস্যা, যার মধ্যে প্রদাহ এবং সংক্রমণের ভিন্ন অংশ জড়িত হয়। নিম্নে এদের পার্থক্য তুলে ধরা হল:
ফ্যারিঞ্জাইটিস (Pharyngitis):
- সংজ্ঞা: ফ্যারিঞ্জাইটিস হলো ফ্যারিঞ্জের প্রদাহ, যেটি হচ্ছে গলার পিছনের টিউব যে টিউব মুখ এবং নাসারন্ধ্র থেকে খাবার নালী এবং শ্বাসনালীর সাথে যুক্ত করে।
- প্রধান লক্ষণগুলি: সাধারণত এতে গলা ব্যথা, অস্বস্তি, খাওয়ার সময় ব্যথা, এবং কখনও কখনও জ্বর দেখা দেয়।
- কারণ: এটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া যেমন স্ট্রেপ্টোককাস দ্বারা হতে পারে।
টনসিলাইটিস (Tonsillitis):
- সংজ্ঞা: টনসিলাইটিস হলো টনসিলের প্রদাহ যা গলার পিছনে, ফ্যারিঞ্জের দুই পাশে অবস্থিত লিম্ফোয়েড টিস্যু।
- প্রধান লক্ষণগুলি: লক্ষণগুলি মধ্যে রয়েছে গলা ব্যথা, টনসিল ফোলা, খাওয়া বা গিলতে অসুবিধা, বদ্ধ মনে হওয়া, মুখ থেকে দুর্গন্ধ, এবং লালের উপর সাদা বা হলুদ প্যাচ দেখা যেতে পারে।
- কারণ: এই প্রদাহ সাধারণত ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া, বিশেষ করে স্ট্রেপ্টোককাস দ্বারা হয়।
উভয় অবস্থার চিকিৎসা ভিন্ন হতে পারে। ফ্যারিঞ্জাইটিস এর চিকিৎসা প্রায়ই উপরে উল্লেখ করা হোম ট্রিটমেন্ট এবং টনসিলাইটিস এর চিকিৎসা হয়তো দরকার পড়তে পারে এন্টিবায়োটিকের, বা চরম ক্ষেত্রে টনসিলেক্টমি (টনসিল অপসারণ)। যেকোনো সংক্রামণ বা প্রদাহ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে গেলে বা গুরুতর হলে, অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন।
ফ্যারিঞ্জাইটিসের লক্ষণ
ফ্যারিঞ্জাইটিসের লক্ষণ নিম্নরূপ:
- গলা ব্যাথা
- গিলতে বা খেতে কষ্ট হওয়া
- গলা লাল হয়ে যাওয়া এবং ফুলে যাওয়া
- টনসিলে সাদা দাগ বা পুস
- গলার লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া
- কণ্ঠস্বর পরিবর্তন বা হারানো
- জ্বর ও ঠান্ডা লেগে থাকা
- কাশি
চিকিৎসা
ভাইরাল ফ্যারিঞ্জাইটিসের চিকিৎসা:
ভাইরাল ফ্যারিঞ্জাইটিস হলো গলার ফ্যারিঞ্জ নামক অংশের প্রদাহ যা সাধারণত ভাইরাস জনিত হয়। এর প্রধান চিকিৎসা হচ্ছে ঘরোয়া ও সমর্থনমূলক থেরাপি, যাতে শরীর নিজে নিজে ভাইরাসের সাথে লড়াই করতে পারে। নিচে কিছু পদ্ধতির বর্ণনা দেওয়া হলো:
বিশ্রাম নিন:
প্রচুর বিশ্রাম সংক্রামণে আক্রান্ত শরীরের জন্য সাহায্যকারী হয়।
প্রচুর পানি পান করুন:
পর্যাপ্ত পানি পান করলে দেহ হাইড্রেটেড থাকে এবং টক্সিনস দেহ থেকে বের হয়ে যেতে পারে।
গরম পানি এবং লবণের গার্গল:
গরম পানির সাথে এক চিমটি লবণ মিশিয়ে গার্গল করলে গলা ব্যথা এবং ফুলে যাওয়া কমে যায়।
ঠান্ডা বা গরম সেঁক:
গলার ব্যথা কমাতে এবং শিথিল করতে গরম বা ঠান্ডা সেঁক উপকারী।
থ্রট লজেনজেস:
মার্কেটে পাওয়া যায় এমন থ্রট লজেনজেস গ্রহণ করলে গলা ব্যথা এবং খুসখুস কমতে পারে।
প্যারাসিটামল বা ইবুপ্রোফেন:
জ্বর এবং গলা ব্যথা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল বা ইবুপ্রোফেন গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে এই ওষুধ গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিৎ।
ধোঁয়া এবং দূষণ এড়িয়ে চলুন:
ধোঁয়া এবং দূষণ গলার প্রদাহ বাড়িয়ে দেয়, তাই এগুলো থেকে দূরে থাকা ভালো।
সুষম খাদ্য:
ভিটামিন C এবং অন্যান্য পুষ্টিকর উপাদানের প্রাবর্তি থাকা সুষম খাবার সংক্রামণের সময় আরো বেশি গুরুত্ব পায়।
এক্ষেত্রে সেরে উঠতে কিছু সময় লাগবে। আর যদি লক্ষণ খুব খারাপ হয় অথবা অনেক দিন ধরে স্থায়ী হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা উচিত। তা ছাড়া, শিশুদের বা গুরুতর মাউথ সমস্যাযুক্ত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
ব্যাকটেরিয়াল ফ্যারিঞ্জাইটিসের চিকিৎসা:
ব্যাকটেরিয়াল ফ্যারিঞ্জাইটিসের চিকিৎসা হিসাবে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ করা হয়। পূর্ণ চিকিৎসা চক্র সমাপ্ত করা গুরুত্বপূর্ণ, নইলে ইনফেকশন পুনরায় হতে পারে বা ব্যাকটেরিয়া ঔষধ প্রতিরোধী হতে পারে।
প্রতিরোধ ও সতর্কতা:
ভালো হাত ধোয়া, অসুস্থ ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকা, মুখ ঢাকা এবং ব্যক্তিগত জিনিস পরিবর্তন না করে তাদের অবরোধ করা হল ফ্যারিঞ্জাইটিস প্রতিরোধের সেরা উপায়গুলো।
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার নির্দেশিকা:
গলা ব্যথা খুব বেশি হলে, গিলতে বা শ্বাস নিতে সমস্যা হলে, উচ্চ জ্বর থাকলে, বা লক্ষণগুলো এক সপ্তাহের বেশি সময় থাকলে, অবশ্যই একজন ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
সিদ্ধান্ত
ফ্যারিঞ্জাইটিস একটি সাধারণ অবস্থা হলেও, এটি বেশ কম্ফর্টেবল এবং ভোগান্তিকর হতে পারে। এর কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসার সবিস্তার জানা থাকলে রোগীরা এটি দ্রুত এবং সম্মানের সাথে মোকাবেলা করতে পারে। যাইহোক, সংশ্লিষ্ট লক্ষণগুলি যদি গুরুতর হয় অথবা উন্নতি না হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।










