মাসিকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
নারীদের মাসিক চক্র একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। তবে অনেক নারীর ক্ষেত্রে মাসিকের সময় রক্তক্ষরণের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হতে পারে। এই অবস্থাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় Heavy Menstrual Bleeding (HMB) বা Menorrhagia। এটি শুধু অস্বস্তিকরই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক দুর্বলতা, রক্তশূন্যতা, মানসিক চাপ এবং দৈনন্দিন জীবনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
অনেক নারী এই সমস্যাকে স্বাভাবিক ভেবে চিকিৎসা নেন না। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
✅ মাসিকে কতটুকু রক্তক্ষরণ হলে তা অতিরিক্ত ধরা হয়?
মাসিক সাধারণত ২–৭ দিন স্থায়ী হয় এবং গড়ে ৩০–৪০ মিলিলিটার রক্তপাত স্বাভাবিক। ৮০ মিলিলিটার বা তার বেশি রক্তপাত হলে তাকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ধরা হয়।
✅ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের লক্ষণগুলো হলো—
- প্রতি ১–২ ঘণ্টায় প্যাড/ট্যাম্পন পরিবর্তন করতে হয়
- রাতে প্যাড ভিজে বিছানা নোংরা হয়ে যায়
- বড় আকারের রক্তের চাকা বের হয়
- একসাথে দুইটি স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার করতে হয়
- মাসিক ৭ দিনের বেশি স্থায়ী হয়
- আগের তুলনায় রক্তপাতের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়
এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
✅ মাসিকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণ
অনেক সময় নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না। তবে বেশ কিছু শারীরিক ও হরমোনজনিত সমস্যা এর জন্য দায়ী হতে পারে।
✅ ১. জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের রোগ
ফাইব্রয়েড (Fibroid)
জরায়ুর ভেতরে অ-ক্যান্সার টিউমার। লক্ষণ:
- অতিরিক্ত রক্তপাত
- তলপেটে ব্যথা
- পেট ভারী লাগা
এন্ডোমেট্রিয়োসিস (Endometriosis)
জরায়ুর টিস্যু জরায়ুর বাইরে বেড়ে ওঠে। লক্ষণ:
- তীব্র ব্যথা
- ভারী রক্তপাত
- যৌন মিলনে ব্যথা
এডেনোমায়োসিস
জরায়ুর দেয়ালের ভেতরে এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু প্রবেশ করে। লক্ষণ:
- তীব্র ব্যথা
- দীর্ঘস্থায়ী রক্তপাত
এন্ডোমেট্রিয়াল পলিপ
জরায়ুর ভেতরে ছোট প্রবৃদ্ধি। লক্ষণ:
- অনিয়মিত রক্তপাত
- ভারী মাসিক
PID (Pelvic Inflammatory Disease)
প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ। লক্ষণ:
- তলপেটে ব্যথা
- দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব
- জ্বর
- দুই মাসিকের মাঝে রক্তপাত
জরায়ুর ক্যান্সার
বিশেষত মেনোপজের পর অস্বাভাবিক রক্তপাত দেখা যায়।
PCOS (Polycystic Ovary Syndrome)
হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে অনিয়মিত ও ভারী মাসিক হতে পারে।
✅ ২. হরমোনের অসামঞ্জস্যতা
ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের ভারসাম্য নষ্ট হলে এন্ডোমেট্রিয়াম মোটা হয়ে যায়, ফলে রক্তপাত বেড়ে যায়।
কারণগুলো হতে পারে—
- স্ট্রেস
- অতিরিক্ত ওজন
- হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া
- থাইরয়েড সমস্যা
- বয়সজনিত পরিবর্তন (পেরিমেনোপজ)
✅ ৩. অন্যান্য শারীরিক সমস্যা
- রক্ত জমাট বাঁধার রোগ
- থাইরয়েডের সমস্যা
- ডায়াবেটিস
- লিভারের রোগ
- কিডনির সমস্যা
✅ ৪. ঔষধ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কপার টি (IUD)
প্রথম ৩–৬ মাস রক্তপাত বাড়তে পারে।
রক্ত পাতলা করার ওষুধ
যেমন—
- অ্যাসপিরিন
- ওয়ারফারিন
- হেপারিন
কেমোথেরাপির কিছু ওষুধ
হারবাল সাপ্লিমেন্ট
- Ginseng
- Ginkgo
- Soy
✅ গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণ
গর্ভাবস্থায় যোনিপথে রক্তপাত হলে তা জরুরি সতর্কতার বিষয়। এটি হতে পারে—
- গর্ভপাতের ঝুঁকি
- একটোপিক প্রেগন্যান্সি
- প্লাসেন্টার সমস্যা
এক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
✅ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ঝুঁকি
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে দেখা দিতে পারে—
- রক্তশূন্যতা (অ্যানিমিয়া)
- মাথা ঘোরা
- শ্বাসকষ্ট
- দুর্বলতা
- ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
- কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া
- মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
✅ কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
- রক্তক্ষরণ হঠাৎ বেড়ে গেলে
- মাসিক ৭ দিনের বেশি স্থায়ী হলে
- দুই মাসিকের মাঝে রক্তপাত হলে
- তীব্র ব্যথা, জ্বর বা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব থাকলে
- গর্ভাবস্থায় রক্তপাত হলে
- রক্তশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে
✅ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের পরীক্ষা
চিকিৎসক সাধারণত নিম্নলিখিত পরীক্ষা করতে পারেন—
- CBC (রক্ত পরীক্ষা)
- থাইরয়েড পরীক্ষা
- হরমোন পরীক্ষা
- আল্ট্রাসনোগ্রাফি
- প্যাপ স্মিয়ার
- এন্ডোমেট্রিয়াল বায়োপসি
- হিস্টেরোস্কপি
✅ মাসিকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের চিকিৎসা
চিকিৎসা নির্ভর করে—
- রোগীর বয়স
- রক্তক্ষরণের কারণ
- ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা
- সামগ্রিক স্বাস্থ্য
✅ ১. ঔষধ ও হরমোন থেরাপি
IUS (হরমোনযুক্ত ডিভাইস)
জরায়ুতে স্থাপন করা হয়, রক্তপাত কমায়।
কম্বাইন্ড পিল
হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে রক্তপাত কমায়।
প্রোজেস্টোজেন পিল
এন্ডোমেট্রিয়াম পাতলা করে।
ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড
রক্তপাত কমাতে কার্যকর।
NSAIDs
ব্যথা কমায় এবং রক্তপাতও কিছুটা কমায়।
✅ ২. অপারেশন
এন্ডোমেট্রিয়াল অ্যাব্লেশন
জরায়ুর ভেতরের স্তর নষ্ট করা হয়।
মায়োমেকটমি
ফাইব্রয়েড অপসারণ।
ইউটেরাইন আর্টারি এম্বোলাইজেশন
ফাইব্রয়েডে রক্ত সরবরাহ বন্ধ করা হয়।
হিস্টেরেকটমি
জরায়ু অপসারণ—শেষ বিকল্প।
✅ প্রতিরোধ ও জীবনযাপনে পরিবর্তন
- আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া
- নিয়মিত ব্যায়াম
- স্ট্রেস কমানো
- পর্যাপ্ত ঘুম
- ওজন নিয়ন্ত্রণ
- অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা
✅ শেষ কথা
মাসিকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ একটি সাধারণ সমস্যা হলেও অবহেলা করলে তা জটিল হতে পারে। সময়মতো সঠিক পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিলে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নিজের শরীরের পরিবর্তনগুলো খেয়াল করুন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। 1
আরো পড়ুন…….
নারী স্বাস্থ্য সচেতনতা: নিজের যত্নে নারীর শক্তি
বাংলাদেশে স্তন ক্যান্সার: সচেতনতা বাড়লেও স্ক্রিনিং ও প্রতিরোধে তৎপরতা কম












