গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড পরীক্ষা কেন জরুরি
আমাদের শরীরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যাদের বলা হয় হরমোন। এগুলো রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে তাদের কাজ করার সিগন্যাল দেয়। থাইরয়েড হরমোন এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন, যা গর্ভাবস্থায় শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গর্ভবতী মায়ের শরীরে থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি থাকলে শিশুর মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে, এমনকি গর্ভপাত বা মৃতপ্রসবের ঝুঁকিও বাড়ে। এজন্যই গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড পরীক্ষা করানো খুব জরুরি।
থাইরয়েড পরীক্ষা কী
আমাদের গলার সামনের দিকে থাকা থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি হয় — থাইরক্সিন (T4) এবং ট্রাইআয়োডোথাইরোনিন (T3)।
এদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি, যা থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (TSH) নিঃসরণ করে।
রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এই হরমোনগুলোর মাত্রা পরিমাপ করাই থাইরয়েড পরীক্ষা। সাধারণত প্রথমে TSH পরীক্ষা করা হয়; প্রয়োজনে T3 ও T4 পরীক্ষাও করা হয়।
কখন থাইরয়েড পরীক্ষা করা হয়
গর্ভাবস্থার প্রথম চেকআপের সময়ই ডাক্তাররা সাধারণত TSH পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন।
ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তীতে আবার পরীক্ষা করা লাগতে পারে।
গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড পরীক্ষার গুরুত্ব
থাইরয়েড হরমোন শিশুর বুদ্ধি, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে অপরিহার্য।
গর্ভাবস্থার প্রথম ১৮–২০ সপ্তাহ পর্যন্ত শিশুটি সম্পূর্ণরূপে মায়ের হরমোনের ওপর নির্ভরশীল থাকে।
যদি এই হরমোনের ঘাটতি হয়, তবে:
-
শিশুর আইকিউ কম হতে পারে
-
কম ওজন নিয়ে জন্মানো
-
গর্ভপাত বা মৃতপ্রসবের ঝুঁকি
-
মায়ের শরীরে হরমোনজনিত জটিলতা
গর্ভাবস্থায় TSH এর স্বাভাবিক মাত্রা
‘বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি’র সুপারিশ অনুযায়ী গর্ভাবস্থায় TSH এর স্বাভাবিক মাত্রা:
| ত্রৈমাসিক | স্বাভাবিক মাত্রা (mIU/L) |
|---|---|
| প্রথম ত্রৈমাসিক | ০.১ – ৩.০ |
| দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক | ০.২ – ৪.০ |
| তৃতীয় ত্রৈমাসিক | ০.৩ – ৪.০ |
হাইপোথাইরয়েডিজম (Hypothyroidism)
যখন রক্তে TSH এর মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, তখন বুঝতে হবে থাইরয়েড হরমোন কম উৎপন্ন হচ্ছে।
এর ফলে—
-
শিশুর বুদ্ধির বিকাশ ব্যাহত হয়
-
মায়ের গর্ভপাত ও রক্তশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে
-
প্রি-এক্লাম্পসিয়া ও প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ হতে পারে
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
হাইপারথাইরয়েডিজম (Hyperthyroidism)
যখন রক্তে TSH কম এবং T3/T4 বেশি, তখন হাইপারথাইরয়েডিজম বলা হয়।
চিকিৎসা না করালে—
-
শিশুর জন্মগত ত্রুটি হতে পারে
-
মায়ের উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে
সঠিক সময়ে শনাক্ত ও চিকিৎসা নিলে মা ও শিশু দুজনই সুস্থ থাকতে পারে।
থাইরয়েড পরীক্ষার প্রক্রিয়া
এই পরীক্ষা সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা ভিত্তিক। সাধারণত হাতের শিরা থেকে সামান্য রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করা হয়।
প্রক্রিয়াটি নিরাপদ এবং কয়েক মিনিটেই সম্পন্ন হয়।
রক্ত দেওয়ার আগে কিছু সতর্কতা:
-
আপনি যদি অসুস্থ থাকেন, সুস্থ হয়ে পরীক্ষা করুন
-
রক্তপাতের সমস্যা বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ খেলে ডাক্তারকে জানান
-
এক্স-রে বা সিটি স্ক্যানে কনট্রাস্ট ডাই ব্যবহার করে থাকলে আগেই জানান
কোথায় পরীক্ষা করা যায়
প্রায় সব সরকারি ও বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে TSH পরীক্ষা হয়।
কিছু সরকারি হাসপাতালে এটি নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগে করা হয়, যাকে অনেক স্থানে পরমাণু বিভাগ বা আণবিক শক্তি বিভাগ বলা হয়।
পরীক্ষার ফলাফল ও সময়
ফলাফল সাধারণত ২–৭ দিনের মধ্যে পাওয়া যায়। অন্য পরীক্ষাগুলোর রিপোর্টের সাথে একত্রে সংগ্রহ করলে সুবিধা হয়।
থাইরয়েড পরীক্ষার খরচ
বাংলাদেশে গড়ে—
-
TSH পরীক্ষা: প্রায় ৭০০ টাকা
-
T4 পরীক্ষা: অতিরিক্ত ৯০০ টাকা
সরকারি প্রতিষ্ঠানে খরচ কিছুটা কম হতে পারে, তবে বেসরকারি সেন্টারে কিছুটা বেশি লাগতে পারে।
উপসংহার
গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড পরীক্ষা মা ও শিশুর জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সঠিক সময়ে পরীক্ষা ও চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক জটিলতা এড়ানো যায়।
তাই গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে অন্তত একবার হলেও TSH পরীক্ষা করানো উচিত।










