ভূমিকা
গ্যাংগ্রিন হল শরীরের কোনো একটি অংশের টিস্যু (কলা) মারা যাওয়ার একটি গুরুতর অবস্থা, যা মূলত রক্ত সরবরাহের অভাবে ঘটে। এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি বিষয় এবং দ্রুত চিকিৎসা না করলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গ্যাংগ্রিন আসলে এক ধরনের টিস্যুর মৃত্যু (Necrosis), যা প্রাথমিকভাবে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ঘটে। রক্তের অভাবে টিস্যুগুলো প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি পায় না, ফলে সেগুলো মারা যায়। এটি সাধারণত হাত ও পায়ের আঙ্গুলে বেশি দেখা গেলেও শরীরের যেকোনো অংশ এমনকি অভ্যন্তরীণ অঙ্গেও হতে পারে।ভূমিকা
গ্যাংগ্রিনের প্রকারভেদ: ৬ ধরন
গ্যাংগ্রিন প্রধানত ৬ প্রকারের হতে পারে:
-
শুষ্ক গ্যাংগ্রিন (Dry Gangrene)
-
এটি ধীরে ধীরে বিকশিত হয়।
-
ত্বক শুষ্ক, কুঁচকানো এবং কালো বা গাঢ় বেগুনি-নীল বর্ণ ধারণ করে।
-
ডায়াবেটিস এবং এথেরোস্ক্লেরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এটি সাধারণ।
-
-
স্যাঁতসেঁতে গ্যাংগ্রিন (Wet Gangrene)
-
এটি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ফলে হয়।
-
আক্রান্ত স্থান ফুলে যায়, ফোসকা পড়ে এবং স্যাঁতসেঁতে ভাব থাকে।
-
এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন।
-
-
গ্যাস গ্যাংগ্রিন (Gas Gangrene)
-
এটি পেশী টিস্যুর গভীরে হয়।
-
নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া টিস্যুর ভিতরে গ্যাস তৈরি করে, যা স্পর্শ করলে একটি ক্র্যাকলিং শব্দ (ক্রেপিটাস) ощущается।
-
অত্যন্ত দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং জীবন-threatening।
-
-
অভ্যন্তরীণ গ্যাংগ্রিন (Internal Gangrene)
-
এটি অ্যাপেন্ডিক্স, অন্ত্র বা গলব্লাডারের মতো অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলিকে আক্রান্ত করে।
-
যখন কোনো অঙ্গে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয় তখন এটি ঘটে।
-
-
ফোর্নিয়ার গ্যাংগ্রিন (Fournier’s Gangrene)
-
এটি যৌনাঙ্গ ও পায়ুপথের এলাকাকে আক্রান্ত করে।
-
পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
-
-
মেলেনির গ্যাংগ্রিন (Meleney’s Gangrene)
-
এটি একটি বিরল প্রকার, যা সাধারণত অস্ত্রোপচারের কয়েক সপ্তাহ পরে ত্বকে ব্যথাযুক্ত ক্ষত সৃষ্টি করে।
-
গ্যাংগ্রিনের প্রধান কারণসমূহ
-
রক্ত সঞ্চালনের ব্যাঘাত: এথেরোস্ক্লেরোসিস, পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ।
-
ডায়াবেটিস: দীর্ঘমেয়াদী ডায়াবেটিস রক্তনালী ও স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত করে।
-
গুরুতর আঘাত: দুর্ঘটনা, পোড়া বা চূর্ণবিচূর্ণ injury রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
-
সংক্রমণ: কোনো ক্ষত বা অস্ত্রোপচারের স্থানে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ।
-
ধূমপান: রক্তনালী সংকুচিত করে ও রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়।
-
অস্ত্রোপচার: জটিল অস্ত্রোপচারের পর রক্ত সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে।
-
ফ্রস্টবাইট: অতিরিক্ত ঠান্ডার সংস্পর্শে টিস্যু জমে যাওয়া।
গ্যাংগ্রিনের লক্ষণ ও উপসর্গ
লক্ষণগুলি গ্যাংগ্রিনের প্রকার ও স্থানের উপর নির্ভর করে ভিন্ন হয়:
-
ত্বকের রঙের পরিবর্তন: লালচিতা, নীল, বেগুনি বা কালো হয়ে যাওয়া।
-
তীব্র ব্যথা: আক্রান্ত স্থানে তীক্ষ্ণ, স্পন্দনশীল ব্যথা।
-
ফোলাভাব ও ফোস্কা: তরল বা গ্যাসপূর্ণ ফোস্কা দেখা দিতে পারে।
-
দুর্গন্ধ: মৃত টিস্যু এবং সংক্রমণের কারণে আক্রান্ত স্থান থেকে পচা গন্ধ বের হয়।
-
অসাড়তা বা ঝিনঝিন করা: স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে।
-
ত্বক শীতল ও শক্ত হয়ে যাওয়া (শুষ্ক গ্যাংগ্রিনে)।
-
জ্বর, কাঁপুনি ও দুর্বলতা: সংক্রমণ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ (সেপসিস)।
রোগ নির্ণয় পদ্ধতি
-
শারীরিক পরীক্ষা: ডাক্তার আক্রান্ত স্থান দেখে এবং লক্ষণগুলি মূল্যায়ন করেন।
-
ইমেজিং স্টাডি: এক্স-রে, সিটি স্ক্যান বা এমআরআই-এর মাধ্যমে টিস্যুর ক্ষতি ও গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা।
-
রক্ত পরীক্ষা: সংক্রমণের মাত্রা (সিবিসি) এবং ডায়াবেটিস আছে কিনা দেখা।
-
টিস্যু বায়োপসি: আক্রান্ত টিস্যুর নমুনা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া।
-
কালচার টেস্ট: কোন ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ঘটাচ্ছে তা শনাক্ত করা।
গ্যাংগ্রিনের চিকিৎসা পদ্ধতি
চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হল মৃত টিস্যু অপসারণ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ত প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা।
-
সার্জিক্যাল ডিব্রাইডমেন্ট: আক্রান্ত ও মৃত টিস্যুগুলো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কেটে ফেলা।
-
অ্যান্টিবায়োটিক: শিরার মাধ্যমে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য।
-
অঙ্গচ্ছেদ (Amputation): গুরুতর ক্ষেত্রে, সংক্রমণ আরো না ছড়ায় তার জন্য আক্রান্ত অঙ্গ বা আঙ্গুল কেটে ফেলার প্রয়োজন হতে পারে।
-
রিভাসকুলারাইজেশন: অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারির মাধ্যমে রক্তনালীর বাধা দূর করে রক্ত প্রবাহ ফিরিয়ে আনা।
-
হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি: রোগীকে একটি বিশেষ চেম্বারে রেখে বিশুদ্ধ অক্সিজেন দেওয়া হয়, যা টিস্যুর নিরাময় ও ব্যাকটেরিয়া দমনে সাহায্য করে।
-
ক্ষত যত্ন: নিয়মিত ড্রেসিং পরিবর্তন এবং ক্ষত পরিষ্কার রাখা।
-
অন্তর্নিহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ: ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
ঝুঁকি ও জটিলতা
-
সেপসিস: সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে পড়া, যা জীবনসংশয়ী।
-
অঙ্গ হারানো: অঙ্গচ্ছেদের প্রয়োজন হতে পারে।
-
দীর্ঘস্থায়ী অক্ষমতা: টিস্যুর ব্যাপক ক্ষতির ফলে।
-
মৃত্যু: চিকিৎসায় বিলম্ব বা গুরুতর সংক্রমণের কারণে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন বা জরুরি বিভাগে যান:
-
ত্বকের রং নীল বা কালো হয়ে যাওয়া।
-
ত্বক থেকে পচা গন্ধ বের হওয়া।
-
অব্যাহত ও তীব্র ব্যথা।
-
জ্বর ও কাঁপুনি।
-
ক্ষত স্থান ফুলে যাওয়া এবং ফোসকা পড়া।
-
আক্রান্ত স্থান ঠান্ডা ও অসাড় বোধ হওয়া।
উপসংহার
গ্যাংগ্রিন একটি ভয়ঙ্কর কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য অবস্থা। ডায়াবেটিস, ধূমপান এবং রক্তনালীর রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখলে এর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো যায়। কোনো আঘাত বা ক্ষত ঠিকমতো না শুকালে, বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে, সতর্কতা অবলম্বন করুন। সময়মতো সঠিক চিকিৎসাই পারে আপনার অঙ্গ এবং জীবন বাঁচাতে।












