হার্পিস: একটি নিরব কিন্তু জটিল ভাইরাস সংক্রমণ
হার্পিস একটি নীরব এবং প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যা বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪০% মানুষের দেহে বিদ্যমান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮০% মানুষ জানেনই না যে তাঁরা এই ভাইরাস বহন করছেন। কারণ, অনেকের মধ্যেই হার্পিসের উপসর্গ প্রকাশ পায় না বা খুব হালকা হয়।
হার্পিসের লক্ষণ সাধারণত কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তারপর নিজে থেকেই মিলিয়ে যায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবার ফিরে আসতে পারে — ফলে অনেকেই একে তেমন গুরুতর মনে করেন না, যা আসলে বড় ভুল।
হার্পিস কিভাবে ছড়ায়
হার্পিস সাধারণত হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস (HSV) দ্বারা ছড়ায়, যা আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে অন্যজনের শরীরে প্রবেশ করে। এটি একটি সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ যা সংক্রমণ স্থলে যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত বা আলসার সৃষ্টি করে। সময়ের সাথে সাথে এই ক্ষত স্বাভাবিকভাবে সেরে যায়, কিন্তু ভাইরাস শরীরে থেকে যায়।
HSV সংক্রমণের লক্ষণ
প্রথমবার সংক্রমণে:
-
জ্বর ও শরীর ব্যথা হতে পারে
-
লিম্ফ নোড ফুলে যেতে পারে
-
ক্লান্তি ও অস্বস্তি অনুভূত হয়
পুনরায় সংক্রমণে:
-
উপসর্গের তীব্রতা কম থাকে
-
শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ শুরু করে
সাধারণত সংক্রমণের দুই সপ্তাহ পর ঘা দেখা দেয়, যা ২–৪ সপ্তাহের মধ্যে শুকিয়ে যায়। তবে পরবর্তীতে আবার ফিরে আসতে পারে।
হার্পিসের ধরন ও উপসর্গ
মুখে হার্পিস (Oral Herpes):
এই সংক্রমণ HSV-1 ভাইরাস দ্বারা হয়। ঠোঁট বা মুখের চারপাশে ক্ষত, আলসার, বা কোল্ড সোর দেখা দেয়। সংক্রমণের আগে চুলকানি, জ্বালা, বা ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
হার্পিস-১ ভাইরাস চোখ, হাত বা মস্তিষ্কেও সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
যৌনাঙ্গে হার্পিস (Genital Herpes):
এই সংক্রমণ HSV-2 ভাইরাস দ্বারা হয়।
উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে—
-
যৌনাঙ্গে একাধিক ফোড়া বা ক্ষত
-
পা, কোমর বা পশ্চাদ্দেশে ব্যথা বা ঝনঝনানি
-
প্রস্রাবে জ্বালা ও অস্বস্তি
অনেক সময় এই উপসর্গ এত হালকা হয় যে রোগী বুঝতেই পারেন না তিনি ভাইরাসে আক্রান্ত।
হার্পিস শনাক্তে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা
-
Herpes Simplex Virus I & II – IGG Test
-
Herpes Simplex Virus I & II – IGM Test
এই টেস্টগুলো দ্বারা জানা যায় আপনি HSV-1 বা HSV-2 ভাইরাসে আক্রান্ত কিনা।
হার্পিসের চিকিৎসা
এলোপ্যাথিক চিকিৎসা:
হার্পিসের কোনো স্থায়ী প্রতিষেধক নেই। তবে এলোপ্যাথিক চিকিৎসায় ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখা ও উপসর্গ কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়। এর ফলে ঘাঁ দ্রুত শুকিয়ে যায় ও সংক্রমণ কমে।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা:
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় হার্পিসের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি দেখা যায়।
-
প্রথম মাস থেকেই আরাম পাওয়া যায়
-
সম্পূর্ণ নিরাময়ে প্রায় ৬ মাস পর্যন্ত চিকিৎসা নিতে হয়
তবে সঠিক ফল পেতে অবশ্যই অভিজ্ঞ হোমিও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ ভুল চিকিৎসা করলে সময় নষ্ট হয়, আর ভাইরাস আরও গভীরে ছড়িয়ে পড়ে।
একজন দক্ষ হোমিও চিকিৎসক রোগ পর্যবেক্ষণ করে, রোগীর অবস্থা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ওষুধ ও মাত্রা নির্ধারণ করেন। ইনশাআল্লাহ, নিয়মিত চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।
প্রতিরোধের উপায়
-
আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা
-
ব্যক্তিগত জিনিসপত্র (তোয়ালে, লিপ বাম ইত্যাদি) শেয়ার না করা
-
যৌন সম্পর্কের সময় সুরক্ষা ব্যবহার করা
-
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা
উপসংহার
হার্পিস একটি দীর্ঘস্থায়ী ভাইরাস সংক্রমণ, যা সময় মতো চিকিৎসা ও সচেতনতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
যদি আপনি বা আপনার কাছের কেউ উপসর্গ অনুভব করেন, দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং নিয়মিত টেস্ট করান।
এম এম এইচ আহমদ
মাদানী হোমিওপ্যাথিক ইন্টারন্যাশনাল
আরো পড়ুন
ভাল হয়ে গেল লিভার ক্যান্সারসহ টিউমার











