ভূমিকা
থ্যালাসেমিয়া একটি জিন-নিয়ন্ত্রিত রক্তরোগ, যেখানে হিমোগ্লোবিন গঠনে ত্রুটি ঘটে। হিমোগ্লোবিন হলো অক্সিজেন পরিবহনকারী প্রধান উপাদান, তাই এর কম বা বিকৃত রূপ শরীরকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন দিতে পারে না। ফলে রোগী ক্লান্তি, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট প্রভৃতি উপসর্গ অনুভব করেন।
বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া একটি গুরত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা। বহু পরিবার এতে আক্রান্ত হয়ে মানসিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
১. থ্যালাসেমিয়ার প্রধান ধরন
১.১ আলফা থ্যালাসেমিয়া
-
মানুষের চারটি আলফা-জিন থাকে।
-
একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে লক্ষণপ্রকাশ নেই, সাধারণ জীবন চলতে পারে।
-
দুইটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে — Alpha-thalassemia minor / trait (মৃদু উপসর্গ)
-
তিনটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে — হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ (Hemoglobin H disease)
-
চারটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে — Alpha-thalassemia major / Hydrops fetalis, যা প্রায়শই গর্ভেই ভ্রূণ মারা যায়
১.২ বিটা থ্যালাসেমিয়া
-
বিটা-শ্রেণীতে দুইটি জিন থাকে।
-
একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে — Beta-thalassemia minor / trait (প্রচুর ক্ষেত্রে লক্ষণহীন)
-
দুইটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে — Beta-thalassemia major (Cooley’s anemia)
-
জন্মের প্রথম বছর বা দুই বছরের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে
-
untreated থাকলে শিশুর মৃত্যু ঘটতে পারে
-
সাধারণভাবে, বিটা থ্যালাসেমিয়ার তীব্রতা আলফা-থ্যালাসেমিয়ার চেয়েও বেশি।
২. থ্যালাসেমিয়ার উপসর্গ
নিচে কিছু সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ন উপসর্গ আলোচনা করছি:
-
সর্বদা ক্লান্তি ও দুর্বলতা
-
শ্বাসকষ্ট
-
ত্বক ফ্যাকাশে বা হলদে রং
-
জন্ডিস (কলা বা হলদে পিগমেন্ট)
-
মুখ-মণ্ডল বা হাড়ের বিকৃতি (বিশেষ করে চিবির অংশ)
-
প্লীহার (spleen) বড় হওয়া
-
অস্বাভাবিক অস্থি গঠন
-
হাই রক্ত লৌহ (iron) জমে যাওয়া — গলবড়া, হৃদযন্ত্রের প্রভাব
-
ধীরশ্রুতিতে শারীরিক বৃদ্ধি (শিশুদের ক্ষেত্রে)
-
গাঢ় রঙের প্রস্রাব
৩. কারণ ও বংশানুক্রমিকতা
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশানুক্রমিক (জিনগত) রোগ। এই রোগের জন্য দায়ী জিন আসে বাবা ও মায়ের মধ্য থেকে।
-
যদি বাবা ও মা উভয়েই থ্যালাসেমিয়া বাহক (trait) হন, তবে শিশুর থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২৫%
-
বাহক হওয়ার সম্ভাবনা: ৫০%
-
সম্পূর্ণ নির্ভর করে জিনের মিল ও বিকৃতি
বিশ্বে আনুমানিক ৬০–৮০ মিলিয়ন মানুষ বিটা থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করে।
থ্যালাসেমিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলিতে বেশি দেখা যায়।
৪. রূপ ও তীব্রতা
-
মাইনর / trait: সাধারণত হালকা বা লক্ষণহীন।
-
মেজর / গুরুতর রূপ: রোগের তীব্র উপসর্গ, নিয়মিত রক্ত সংযোগ প্রয়োজন।
আলফা-থ্যালাসেমিয়া সাধারণত কম তীব্র, অনেক ক্ষেত্রেই জীবনযাপন প্রায় স্বাভাবিক থাকে।
৫. تشخیص ও নির্ণয়
থ্যালাসেমিয়া নির্ণয়ে সাধারণত নিচের উপায় ব্যবহার করা হয়:
-
রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে — CBC (Complete Blood Count), RBC indices
-
হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফোরেসিস — শিকল ধরনের হিমোগ্লোবিন নির্ণয়
-
জিন পরীক্ষণ (Genetic testing) — জিন বিকৃতি সনাক্ত করতে
-
পরিবার ইতিহাস — আগেই কোন সদস্যে এই রোগ আছে কিনা
নির্ভুল নির্ণয় রোগের পরিকল্পিত চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য।
৬. চিকিৎসা পন্থা
থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসা সম্পূর্ণরূপে “নিরাময়” বলা যায় না, কিন্তু রোগ নিয়ন্ত্রণ ও জীবন গুণমান উন্নয়ন সম্ভব।
৬.১ মাইনর / বাহক ক্ষেত্রে
-
সাধারণত চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না
-
পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যপরামর্শ ও পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট
৬.২ মেজর ও তীব্র ক্ষেত্রে প্রধান পন্থা
-
নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন (Regular Blood Transfusion)
-
রোগীর শরীরে পর্যাপ্ত রক্ত ও হিমোগ্লোবিন বজায় রাখে
-
তবে অতিরিক্ত রক্ত সঞ্চালনের ফলে লোহা (iron) অতিরিক্ত জমা হতে পারে
-
-
আয়রন চিলেশন থেরাপি (Iron Chelation Therapy)
-
অতিরিক্ত লৌহ শরীর থেকে বের করার জন্য
-
লৌহ পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ না করলে তা বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ক্ষতি করতে পারে
-
-
হাড় মজ্জা প্রতিস্থাপন / স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন
-
যদি দাতা পাওয়া যায়
-
এই পন্থা যুক্তিসম্পন্ন সম্ভাবনা রাখে রোগ নিয়ন্ত্রণে
-
-
সহায়ক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ
-
পুষ্টি ও লিব্রেন্ট যত্ন
-
সংক্রমণ প্রতিরোধ
-
অঙ্গ-রোগ পরীক্ষা (যকৃত, হার্ট)
-
নিয়মিত ডাক্তার পরিদর্শন
-
৭. হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে মন্তব্য
বর্তমানে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে, থ্যালাসেমিয়া একটি জিনিনির্ভর জটিল রোগ, এবং গঠনগত হিমোগ্লোবিন ত্রুটি রয়েছে।
“হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের মতে, প্রায় 70 থেকে 80 % রোগীকে হোমিও চিকিৎসার মাধ্যমে পুরোপুরি রোগমুক্ত করা সম্ভব”
আমি সতর্কভাবে বলতে চাই:
-
যে কোন চিকিৎসা নিতে গেলে প্রত্যয়িতভাবে অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
-
তবে রক্তসংক্ৰান্ত রোগ (hematologic diseases) সংক্রান্ত ক্ষেত্রে একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য চিকিৎসা হলো রক্ত সঞ্চালন, চিলেশন, স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট ইত্যাদি।
-
বিকল্প বা পরComplementary পন্থা (যেমন হোমিওপ্যাথি) শুধুমাত্র সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত, এবং শুধুমাত্র কারিগরিভাবে প্রমাণিত পন্থার বিকল্প হিসেবে নয়।
৮. জীবনযাপন ও প্রতিরোধ
-
রোগের দায়ী জিন বাহক হলে, বিবাহ-পরিকল্পনার সময় জিন পরামর্শ (genetic counseling) করা উচিত
-
গর্ভপরীক্ষার মাধ্যমে (prenatal testing) সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণ করা যেতে পারে
-
রোগীদের পর্যাপ্ত পুষ্টি, বিশ্রাম ও সাপেক্ষ চিকিৎসা অনুসরণ জরুরি
-
রোগ নির্ভর জীবনযাপন (হাসপাতাল যাত্রা, রক্তসংগ্রহ) মানসিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে — তাই পরিবার ও সামাজিক সহায়তার গুরুত্ব বেশি
উপসংহার
থ্যালাসেমিয়া একটি জটিল এবং গভীরভাবে জিননির্ভর রক্তরোগ।
ঠিক সময়ে নির্ণয়, সঠিক পরিকল্পিত চিকিৎসা এবং নিয়মিত নজরদারি রোগীদের সুস্থ জীবনের সুযোগ দেয়।
আরো পড়ুন
ভাল হয়ে গেল লিভার ক্যান্সারসহ টিউমার









