ভূমিকা
বাংলাদেশে লিভারের রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। ভাইরাস সংক্রমণ, ভেজাল খাবার, অ্যালকোহল, ও মেটাবলিক সমস্যার কারণে অনেকেই লিভারজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। লিভারের সমস্যা শুধু শরীরেই নয়, আমাদের মুখ ও জিহ্বার মাধ্যমেও তার লক্ষণ প্রকাশ করে।
লিভারের সঙ্গে মুখ ও দাঁতের সম্পর্ক
লিভারের রোগের কারণে অনেক সময় মুখে তীব্র দুর্গন্ধ দেখা দেয়, যা সামাজিক অস্বস্তির কারণ হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, লিভারের রোগের সঙ্গে পেরিওডন্টাল বা মাড়ির রোগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। যেমন—
-
নন-অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিজ (NAFLD)
-
লিভার সিরোসিস
-
হেপাটোসেলুলার কারসিনোমা (লিভার ক্যান্সার)
এইসব রোগের ক্ষেত্রে দাঁত ও মাড়ির প্রদাহ বা রক্তপাতের প্রবণতা বেড়ে যায়। তাই লিভারের চিকিৎসার পাশাপাশি মুখগহ্বরের যত্ন নেওয়াও জরুরি।
জিহ্বার মাধ্যমে লিভারের সমস্যা চেনার উপায়
লিভারের অসুস্থতা প্রাথমিক পর্যায়েই জিহ্বায় কিছু বিশেষ চিহ্ন বা লক্ষণ সৃষ্টি করে। নিচে সেই লক্ষণগুলো তুলে ধরা হলো:
১️⃣ জিহ্বা সাদা বা হলুদ হওয়া
জিহ্বায় পুরু, হলুদ বা সাদা আস্তরণ জমলে তা হজমের সমস্যা ও পিত্ত নিঃসরণে বাধা নির্দেশ করতে পারে। এটি সাধারণত ফ্যাটি লিভার বা গলব্লাডার ব্লকেজ–এর লক্ষণ হতে পারে।
২️⃣ জিহ্বা ফেটে যাওয়া বা কুঁকানো
এই অবস্থায় লিভারের শক্তির অচলাবস্থা বোঝায়। মানসিক চাপ, হতাশা, বা মাসিকজনিত জটিলতা থেকেও এমন হতে পারে।
৩️⃣ জিহ্বার পাশে দাঁতের দাগ
জিহ্বার পাশে দাঁতের চিহ্ন থাকলে তা শরীরে স্যাঁতসেঁতে ভাব, ক্লান্তি, ফ্যাটি লিভার বা ডায়াবেটিসের ইঙ্গিত দেয়।
৪️⃣ জিহ্বার পাশে গাঢ় নীল বা বেগুনি দাগ
এগুলো লিভারের স্থবিরতা বা সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের প্রাথমিক সংকেত হতে পারে।
৫️⃣ উজ্জ্বল লাল ও ফোলা জিহ্বা
এটি সাধারণত লিভারের প্রদাহ বা উচ্চ রক্তচাপের সাথে সম্পর্কিত। যেমন হেপাটাইটিসের সময়।
🔴 লিভার রোগে দাঁতের রক্তপাত কেন হয়?
লিভার ব্যর্থ হলে রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকে—
-
ভিটামিন কে’র বিপাকে সমস্যা
-
ফাইব্রিনোলাইসিস বেড়ে যাওয়া
-
রক্তের ক্লটিং উপাদানের ঘাটতি
ফলে মাড়িতে সহজে রক্তপাত হয়, এবং রক্ত বন্ধ হতে সময় লাগে। চিকিৎসায় কখনো ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা, এন্টিফাইব্রিনোলাইটিক এজেন্ট, ও ভিটামিন কে ব্যবহৃত হয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে ক্রনিক লিভার ডিজিজ থাকলে দাঁতে সবুজ দাগ ও এনামেল হাইপোপ্লাসিয়া দেখা যেতে পারে।
🧬 হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস — সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্তের হার উদ্বেগজনক।
-
হেপাটাইটিস সি ভাইরাস সাধারণত সংক্রমিত রক্ত, ইনজেকশন বা যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায়।
-
এটি লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার, ও লিভার ফেইলিউর পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
এছাড়া এই ভাইরাসের কারণে মুখে লাইকেন প্ল্যানাস বা স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা দেখা দিতে পারে।
প্রতিরোধের উপায়:
-
নিরাপদ রক্ত ও সিরিঞ্জ ব্যবহার
-
সুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক
-
হেপাটাইটিস বি’র টিকা গ্রহণ
মনে রাখতে হবে, কেবল হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসই লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ।
🌿 সতর্ক থাকুন, সচেতন হোন
লিভার আমাদের শরীরের “রসায়নাগার”। লিভারের যত্ন নিন—
-
ভেজাল ও চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করুন
-
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
-
মদ্যপান ও ধূমপান থেকে বিরত থাকুন
-
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন
আপনার জিহ্বা যদি অস্বাভাবিক রঙ বা দাগ ধারণ করে, তবে সেটি উপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
✍️ লেখক:
এম. এম. এইচ আহমদ
মাদানী হোমিওপ্যাথিক ইন্টারন্যাশনাল
আরো পড়ুন







