প্যানক্রিয়াটাইটিস কী?
প্যানক্রিয়াটাইটিস (Pancreatitis) হলো অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহজনিত একটি রোগ। “Pancreas” শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘All Flesh’ বা ‘অল ফ্লেশ’। অগ্ন্যাশয় আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা পাচক রস (এনজাইম) এবং ইনসুলিন তৈরি করে। পাচক রস খাবার হজমে সাহায্য করে এবং ইনসুলিন রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ শুরু হয় তখন, যখন পাচক রস প্যানক্রিয়াসেই সক্রিয় হয়ে নিজের টিস্যু হজম করতে শুরু করে। এই অবস্থাকে বলা হয় প্যানক্রিয়াটাইটিস।
প্যানক্রিয়াটাইটিসের প্রকারভেদ
-
অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস (Acute Pancreatitis):
হঠাৎ অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ হলে একে অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস বলা হয়। সঠিক চিকিৎসায় অনেক সময় পুরোপুরি সেরে যায়। -
ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস (Chronic Pancreatitis):
এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ, যা ধীরে ধীরে অগ্ন্যাশয়ের স্থায়ী ক্ষতি করে। সাধারণত অতিরিক্ত মদ্যপান ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এর কারণ।
প্যানক্রিয়াটাইটিসের কারণ
-
পিত্তনালিতে পাথর (Gallstones)
-
অতিরিক্ত মদ্যপান
-
রক্তে লিপিড বা ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যাওয়া
-
অগ্ন্যাশয়ে আঘাত
-
স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ বা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
-
ভাইরাল সংক্রমণ
-
জিনগত কারণ
-
অস্ত্রোপচারের পর জটিলতা
রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ
🔸 অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের লক্ষণ:
-
হঠাৎ পেটে তীব্র ব্যথা
-
ব্যথা পিঠে বা বুকে ছড়িয়ে পড়া
-
বমি বা বমির ভাব
-
খাওয়ার অরুচি
-
জ্বর বা শরীর দুর্বল লাগা
🔸 ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের লক্ষণ:
-
ঘনঘন পেটে ব্যথা
-
খাবার হজম না হওয়া
-
ওজন কমে যাওয়া
-
ডায়াবেটিস হওয়া
-
চর্বিজাতীয় খাবার খেলেই পেটের সমস্যা
প্যানক্রিয়াটাইটিস শনাক্তকরণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা
ডাক্তার সাধারণত নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলির মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করেন:
-
রক্ত পরীক্ষা: অ্যামাইলেজ (Amylase), লাইপেজ (Lipase), লিভার এনজাইম (ALT, AST)
-
ইউরিন টেস্ট: অ্যামাইলেজের মাত্রা
-
সিটি স্ক্যান বা আল্ট্রাসোনোগ্রাম: অগ্ন্যাশয়ের গঠন ও প্রদাহ নির্ণয়
-
CBC, ব্লাড সুগার, ক্যালসিয়াম, ক্রিয়েটিনিন টেস্ট
প্যানক্রিয়াটাইটিসের চিকিৎসা
🔹 অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস:
-
দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন
-
শিরার মাধ্যমে তরল দেওয়া (IV Fluid)
-
ব্যথা নিয়ন্ত্রণের ওষুধ
-
ইনফেকশন রোধে অ্যান্টিবায়োটিক
-
পিত্তনালিতে পাথর থাকলে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন
-
গুরুতর ক্ষেত্রে আইসিইউ সাপোর্ট লাগতে পারে
🔹 ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস:
-
পাচক এনজাইম সাপ্লিমেন্ট
-
ব্যথানাশক ওষুধ
-
এন্ডোস্কোপি বা সার্জারি করে পাচক রসের পথ খুলে দেওয়া
-
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইনসুলিন ব্যবহার
সম্ভাব্য জটিলতা
-
অগ্ন্যাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রস জমা হওয়া
-
শরীরে ফ্লুয়িড লিক হয়ে শক (Shock) তৈরি
-
হৃৎপিণ্ড, লিভার, ফুসফুস, কিডনি ও মস্তিষ্কের বিকলতা
-
জন্ডিস বা পিত্তনালি সরু হয়ে যাওয়া
-
দীর্ঘমেয়াদি ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসে ক্যানসারের ঝুঁকি
সাবধানতা ও প্রতিরোধের উপায়
-
মদ্যপান ও ধূমপান পরিহার করুন
-
তেল-চর্বিযুক্ত খাবার যেমন দুধ, ডিম, রেড মিট এড়িয়ে চলুন
-
ভাজাভুজি ও ফাস্টফুড কম খান
-
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
-
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন
-
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন
শেষ কথা:
প্যানক্রিয়াটাইটিস একটি জটিল রোগ হলেও সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। পেটের ব্যথা বা হজম সমস্যা দেখা দিলে দেরি না করে গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্টের পরামর্শ নিন।
আরো পড়ুন
মাথা ব্যথার প্রকার ও ঘরোয়া চিকিৎসা
ভাল হয়ে গেল লিভার ক্যান্সারসহ টিউমার





